বাংলা রঙ্গমঞ্চের ইতিহাসে ক্যালকাটা থিয়েটারের অবদান আলোচনা কর।
দি নিউ প্লে-হাউস বা ক্যালকাটা থিয়েটার
উদ্বোধন: ১৭৭৫
স্থায়িত্বকাল: ১৭৭৫-১৮০৮ (তেত্রিশ বছর)
প্রতিষ্ঠাতা: জর্জ উইলিয়ামসন
প্রথম রঙ্গালয় প্রতিষ্ঠার পর প্রায় কুড়ি বছর বাদে দ্বিতীয় রঙ্গালয়ের প্রতিষ্ঠা হয়। তখন বড়লাট হেস্টিংসের আমল। জর্জ উইলিয়ামসন এই রঙ্গালয়টি ১৭৭৫ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ করেন। বর্তমান রাইটার্স বিল্ডিং (মহাকরণ)-এর পেছনে লায়ন্স রেঞ্জ-এর উত্তরপশ্চিমে এই রঙ্গালয়টি ছিল। যেখানে এখন ফিনলে কোম্পানীর অফিসবাড়ি।
কলকাতায় প্রথম সংবাদপত্র ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত ‘হিকিস বেঙ্গলী গেজেট’-এর প্রথম সংখ্যার (১৭৮০) প্রথম পৃষ্ঠার বাঁদিকে ক্যালকাটা থিয়েটারের একটি বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়। এই সংবাদপত্রে এই থিয়েটারের অনেক খবর প্রকাশিত হতো।
সম্ভ্রান্ত ইংরেজদের শুভেচ্ছা ও চাঁদা নিয়ে রঙ্গালয়টি তৈরি হয়। অনেকেই এর সদস্য ও অংশীদার হয়েছিলেন। শেয়ারের দাম ছিল হাজার টাকা। প্রায় এক লক্ষ টাকা খরচ করে নাট্যশালাটি তৈরি হয়। পৃষ্ঠপোষকদের মধ্যে ছিলেন—হেস্টিংস, বারওয়েল, স্যার এলিজা ইম্পে প্রমুখ খ্যাতিমান ইংরেজরা। ইংলন্ড থেকে তাদের উপদেষ্টা ডেভিড গ্যারিকের সহায়তায় শিল্পী বার্নার্ড মেসিংককে আনা হয়। তারই নির্দেশে দৃশ্যপট আঁকা হয়েছিল। প্রেক্ষাগৃহের মাঝখানে ছিল ‘পিট’ এবং এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত ‘পিট’-কে ঘিরে ছিল বক্স। এখানে প্রথমদিকে ভারতীয় দর্শকদের প্রবেশাধিকার ছিল। প্রবেশমূল্য ছিল—
বক্স—এক মোহর। পিটসীট—আট সিক্কা টাকা।
তদানীন্তন ইংলন্ডের প্রথম শ্রেণীর রঙ্গালয়ের মতো করে এটিকে গড়ে তোলা হয়।
এই থিয়েটারেই প্রথম ‘Subscription Performance’ প্রথা চালু করা হয়। গোড়া থেকেই সদস্য-দর্শক নির্দিষ্ট থাকার ফলে অভিনয়ের দিন দর্শকাসন খালি থাকত না।
গভর্ণর লর্ড কর্ণওয়ালিসের নির্দেশে কোম্পানীর কোনো কর্মচারী অভিনয়ে অংশগ্রহণের অনুমতি পেত না। শিল্পীরা তাই সবাই ছিল ‘এ্যামেচার’। ভালো শিল্পীর অভাবে রঙ্গালয়টি দুরবস্থায় পড়ে। এখানে নারীচরিত্রে পুরুষেরাই অভিনয় করত। যদিও ইংলন্ডে অভিনেত্রীরা অনেক আগে থেকেই অভিনয় শুরু করেছে। কিন্তু এখানকার কোম্পানীর ডিরেক্টাররা, পাছে অভিনেত্রীদের নিয়ে পুরুষদের মধ্যে গণ্ডগোল শুরু হয়, সেই আশঙ্কায় নারীদের মঞ্চাবতরণে অনুমতি দেয়নি। পরের দিকে অবশ্য অভিনেত্রীরা অংশগ্রহণ করতে থাকে। ততদিনে কোম্পানীর আইন শিথিল হয়ে গেছে।
রঙ্গালয়ের কর্তৃপক্ষের আন্তরিক চেষ্টা করতেন সকল শ্রেণীর দর্শককে আকৃষ্ট করতে। শেক্সপীয়র থেকে শুরু করে বেন জনসন, ফ্রান্সিস বোমল্ট, জন ফ্লেচার, ফিলিপ ম্যাসিঞ্জার, কনগ্রীভ, টমাস অটওয়ে, হেনরি ফিলডিং, সেরিডান প্রভৃতি নাট্যকারের নাটক অভিনয়ের চেষ্টা হয়েছে। হ্যামলেট, ম্যাকবেথ-এর মত গভীব-গম্ভীর বিয়োগান্ত নাটকের যেমন অভিনয় হতো তেমনি লঘু প্রহসনেরও ব্যবস্থা থাকত। সঙ্গীতবহুল নাটকের মধ্যে হ্যান্ডেলস মেশায়া (Handel’s Messiah) নাটকে দর্শক সমাগম হতো সবচেয়ে বেশি।
কয়েকটি উল্লেখযোগ্য অভিনয়ের তালিকা—টমাস অটওয়ের ভেনিস প্রিজার্ভড, জর্জ ফারকুহরের দি বোষ্ট্যাটাজেম, শেক্সপীয়রের দি মার্চেন্ট অব ভেনিস, ওথেলো, ম্যাকবেথ, হ্যামলেট, সেরিডানের স্কুল ফর স্ক্যান্ডাল খুবই প্রশংসা পায়। তাছাড়া লাইক মাস্টার লাইক সন, দি ফাউন্ডলিং, দি সিটিজেন, দি মাইনর, এক্স পারপাসেস গোড়ার দিকের সাফল্যজনক প্রযোজনা। দি ফেয়ার পেনিটেন্ট, দি প্যাডলক, দি পুওর সোলজার, দি আইরিস উইডো, সি স্টপস টু কঙ্কার, দি রিভেঞ্জ প্রভৃতি নৃত্যগীতময় ‘অপেরাধর্মী ও প্রহসনাত্মক’ অভিনয়গুলি দর্শকদের খুবই আকৃষ্ট করেছিল।
শেষের দিকে এই রঙ্গালয়ের অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে পড়ে। কলকাতায় একসঙ্গে দুটি রঙ্গালয় তখন চলা সম্ভব ছিল না দর্শক স্বল্পতার জন্য। কেননা, তখন কলকাতায় ইংরেজের সংখ্যা বেশি ছিল না। দর্শনীয়ও ছিল বেশি। তাই অন্য থিয়েটারের সঙ্গে প্রতিযোগিতা চালাতে গিয়ে হাল্কা নৃত্যগীত ও লঘুচপল ভাড়ামো নাটকের অভিনয় করে যেতে হয়েছে। যে থিয়েটার প্রথমদিকে শেক্সপীয়রের বা অন্য নাট্যকারের উচ্চভাবের নাটক অভিনয় করে খ্যাতিলাভ করেছিল, তাদের এই অধঃপতনে অনেকেই দুঃখ পেয়েছিলেন। তাছাড়া ঠিক এই সময়েই (১৭৯৫) লেবেডেফের বেঙ্গলী থিয়েটারের প্রতিষ্ঠা ও নাট্যাভিনয়ের সাফল্যে ক্যালকাটা থিয়েটারের দুরবস্থা চরমে ওঠে। ম্যানেজার মিঃ রোওয়ার্থ লেবেডেফের নাট্যশালা পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেবার চক্রান্তে লিপ্ত হয়ে পড়েন।
যাইহোক, তেত্রিশ বছর একটানা অভিনয় চালিয়ে দীর্ঘস্থায়ী এই রঙ্গালয়টি ১৮০৮ খ্রিস্টাব্দে বন্ধ হয়ে যায়। ইংলন্ডের বিখ্যাত অভিনেতা ও প্রযোজক ডেভিড গ্যারিকের সাহায্য ও উপদেশ, ম্যাসিংগারের দৃশ্যপট-অঙ্কন এই মঞ্চের গর্বের বিষয়। এই মঞ্চে অভিনয় করে খ্যাতি লাভ করেন ব্যান্ডেল, পোলার্ড, জেমস ব্যাটল, ফ্রিট উড, বিগার, গোল্ডিং, রবিনসন, ফিয়াসবেরি প্রভৃতি অভিনেতা এবং মিসেস হরিটো, মিসেস হিউগেস, মিসেস বেসেট প্রভৃতি অভিনেত্রী। এদের উচ্চমানের অভিনয় ও নৃত্যগীতের পারদর্শিতা ক্যালকাটা থিয়েটারের গৌরবের কারণ। এই থিয়েটারের অভিনেতা ক্যাপ্টেন ‘কল’-কে অসামান্য অভিনয়ের জন্য ‘গ্যারিক অব দি ইস্ট বলা হতো।
১৮০৮ খ্রিস্টাব্দে রঙ্গালয়টি বন্ধ হয়ে গেলে রাজা গোপীমোহন ঠাকুর রঙ্গালয়টি কিনে নিয়ে সেখানে বাজার প্রতিষ্ঠা করেন।
Leave a Reply