বাংলা সাহিত্যে শ্রীচৈতন্যের প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা কর।
বাংলা সাহিত্যে শ্রীচৈতন্যের প্রভাব
বাংলা সাহিত্যে শ্রীচৈতন্যের প্রভাব যে কতখানি রবীন্দ্রনাথ সে প্রসঙ্গের আলোচনা বলেছেন— “বর্ষা ঋতুর মতো মানুষের সমাজে এমন একটা সময় আসে যখন হাওয়ার মধ্যে ভাবের বাষ্প প্রচুর পরিমাণে বিচরণ করিতে থাকে। চৈতন্যের পরে বাংলাদেশের সেই অবস্থা আসিয়াছিল। তখন সমস্ত আকাশ প্রেমের রসে আর্দ্র হইয়াছিল। তাই দেশে সে সময় যেখানে যত কবির মন মাথা তুলিয়া দাঁড়াইয়াছিল, সকলেই সেই রসের বাষ্পকে ঘন করিয়া কত অপূর্ব ভাষা এবং নুতন ছন্দে, কত প্রাচুর্যে ও প্রবলতায় দিকে দিকে বর্ষণ করিয়াছিল।” সত্যিই বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ষোড়শ শতাব্দী যে সুবর্ণযুগ তার অন্যতম প্রেরণা শ্রীচৈতন্যদেব।
শুধু সমাজে নয়, সাহিত্যেও শ্রীচৈতন্যের প্রভাব লক্ষ করা গেল। চৈতন্য কয়েকটি শ্লোক ছাড়া কিছুই লিখে যাননি। অথচ তাঁর জীবনকে কেন্দ্র করে এক সাহিত্যিক পরিমণ্ডল সৃষ্টি হল যার ফসল ফলল বাংলা সাহিত্যে। চৈতন্য আবির্ভাবের পর বাংলা সাহিত্য চৈতন্যপূর্ব, চৈতন্যযুগ ও চৈতন্য-পরবর্তী যুগ এই নামে চিহ্নিত হল।
চৈতন্য আবির্ভাবের পূর্বে বাংলা সাহিত্য ছিল প্রধানত দেবমুখী। চৈতন্য আবির্ভাবের পর সেই সাহিত্যে মানবমহিমার জয় ঘোষিত হল। দেবশক্তি ও অলৌকিকতা হ্রাস পাওয়ায় সাহিত্যে মানুষের মানবতা কীর্তিত হল।
সাহিত্যে রাজরাজড়াদের জীবনচরিত কবিদের দ্বারা কীর্তিত হত। কিন্তু চৈতন্যের পূত, প্রেমময় জীবন নিয়ে বাংলা সাহিত্যে এক নতুন ধারার প্রবর্তন হল—যার নাম হল জীবনীকাব্য। চৈতন্যলীলার ব্যাস বৃন্দাবনদাস তিন খণ্ডে লিখলেন ‘শ্রীচৈতন্য ভাগবত’, কৃষ্ণদাস কবিরাজ রচনা করলেন—‘শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত’। এছাড়া আরো অনেক জীবনীকার শ্রীচৈতন্যের জীবন অবলম্বনে জীবনীকাব্য রচনা করলেন। এইসব জীবনীকাব্যগুলি শুধু ধর্মীয় বা কাব্যিক দিক থেকে নয়, সমকালীন ঐতিহাসিক ও সামাজিক দিক থেকেও এর গুরুত্ব যথেষ্ট।
চৈতন্য আবির্ভাবে বৈষ্ণব সাহিত্যে জোয়ার এসেছিল। এই সময়ে নানা কবি চৈতন্যদেবের নব আদর্শে বৈষ্ণব পদ রচনা শুরু করলেন—
ক. প্রাক্-চৈতন্য যুগে বৈষ্ণব পদকর্তাদের আদর্শ ছিল—ঐশ্বর্য ভক্তি, কিন্তু চৈতন্য আবির্ভাবে তা পরিণত হল মধুর ভক্তিতে। শুধু তাই নয়, রাগানুগা ভক্তির দ্বারা প্রভাবিত হল বৈষ্ণব সাহিত্য।
খ. প্রাক্-চৈতন্য যুগে বৈষ্ণব কবিদের আদর্শ ছিল ভাগবৎ, বিষ্ণুপুরাণ, সংস্কৃত অলংকার শাস্ত্র কিন্তু চৈতন্য আবির্ভাবে চৈতন্য হলেন চৈতন্য যুগে ও তার পরবর্তী যুগে বিশেষ আদর্শ।
গ. প্রাক্-চৈতন্য যুগের সম্ভোগাত্মক প্রেম চৈতন্য আবির্ভাবে শৃঙ্গার রসে পরিণত হল। কারণ চৈতন্য ছিলেন শৃঙ্গার রসরাজ।
ঘ. প্রাক্-চৈতন্য যুগে যেখানে রাধাকৃষ্ণের প্রেমে আধ্যাত্মিকতা ছিল না, চৈতন্য আবির্ভাবে সেক্ষেত্রে আধ্যাত্মিকতা এল।
ঙ. চৈতন্য সমসাময়িক কবিরা চৈতন্যের সান্নিধ্যে এসে বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে মানবিক রস সমৃদ্ধ পদ রচনা করলেন।
চৈতন্য পরবর্তী কালে বৈষ্ণব সাহিত্যে ‘গৌরচন্দ্রিকা’ ও ‘অষ্টকালীয় নিত্যলীলা’ নামে দুটি নতুন ধারা সংযোজিত হল। চৈতন্য ছিলেন রাধাকৃষ্ণের যুগল অবতারবাইরে রাধা ভিতরে কৃষ্ণ। তাই কীর্তনীয়াগণ রাধাকৃষ্ণের লীলা বর্ণনার আগে বৃন্দাবন লীলার সদৃশ গৌরলীলার পদ গান করার জন্য ‘গৌরচন্দ্রিকা’ পর্যায় গাইনে। এই গৌরচন্দ্রিকার পদগুলি বৃন্দাবনলীলার পরমান্নে কপূরের মতো। বৃন্দাবনলীলার প্রস্তুতি হিসাবে গৌরচন্দ্রিকার পদগুলির তাই অসাধারণ মূল্য। যেমন— ‘আজু হাম কি পেখলু নবদ্বীপচন্দ’ (রাধামোহন)। এছাড়া অভিসার পর্যায়ে এল মানবিকতার সঙ্গে আধ্যাত্মিকতা ও গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনের প্রভাব। গোবিন্দদাস এই আদর্শে এই শ্রেণির পদ রচনায় দক্ষতা দেখিয়েছেন।
মঙ্গলকাব্যের কবিগণ চৈতন্য আবির্ভাবের পর তাদের কাব্যের বন্দনা খণ্ডে চৈতন্য। বন্দনা শুরু করলেন। তাছাড়া মঙ্গলকাব্যের দেবদেবীরা ছিলেন মূলত হিংস্র প্রকৃতির। কিন্তু চৈতন্য প্রভাবের ফলে পরবর্তী মঙ্গলকাব্যের দেবদেবীদের হিংস্র রূপটি অনেকটা। কোমলতায় পর্যবসিত হল। পরমত সহিষ্ণু উদার চৈতন্যের ভাবধারার আদর্শে চৈতন্য পরবর্তী মঙ্গলকাব্যের কবিরা সমন্বয়ী চেতনাকে কাব্যে ঠাঁই দিলেন। আবার দ্বিজ রামদেব তার অভয়ামঙ্গলে বিষ্ণুপদ যথেচ্ছ ব্যবহার করলেন। এতেও বোঝা যায়, তার উপর শ্রীচৈতন্যের প্রভাব বর্তমান। উত্তর-চৈতন্য যুগের মনসামঙ্গলের কোনো কোনো কবি যেমন দ্বিজ বংশীদাস মনসার ক্রুরতাকে এবং চাঁদ-মনসার দ্বন্দ্বকে মানবিক করে রূপ দিলেন চৈতন্য প্রভাবে।
রামায়ণ ও মহাভারত বাঙালির কাছে অতি পরিচিত। কৃত্তিবাস চৈতন্যের আগে রামায়ণ রচনা করলেও পরবর্তীকালে তাতে প্রক্ষেপ ঘটেছে। এই প্রক্ষেপের কারণ চৈতন্যের প্রভাব। তাই বীর রামচন্দ্র কোমল প্রকৃতির, কৌশল্যার মধ্যে মা যশোদা অথবা শচীদেবীর স্নেহবাৎসল্য মাতৃত্বের প্রকাশ লক্ষ করা গেল। কাশীরাম দাসের রচনাতেও কৃষ্ণ ও অর্জুনের চরিত্রে যে ভাবান্তর লক্ষ করা যায় তার মূলে ছিল চৈতন্য প্রভাব। এছাড়া চৈতন্যের ভক্তিধর্মের প্রভাবে নানা ভক্তিশাস্ত্রের অনুবাদ হতে থাকল।
লোকসাহিত্য ও বিভিন্ন গীতিকায় নদের ঠাকুরকে নিয়ে বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের কবিরা ছড়া, পাঁচালি, গীতিকা রচনা করলেন। নিমাই সন্ন্যাস পালা রচিত হতে থাকল। আধুনিক সাহিত্যে বিশেষ করে নাটকে চৈতন্যদেবের জীবন ও লীলা অবলম্বন করে রচিত হল ভক্তিমূলক নাটক। এভাবে শ্রীচৈতন্যের প্রভাব বাংলা সাহিত্যে সুদূরপ্রসারী রূপ লাভ করল।
Leave a Reply